1. admin@shikkhasamachar.com : admin :
বৃহস্পতিবার, ০৫ অগাস্ট ২০২১, ০৩:৫৮ পূর্বাহ্ন

বিশ্ব সীকৃতি পেল প্রকৌশলী রেজওয়ানের নৌকা স্কুল – শিক্ষা সমাচার

সমাচার ডেস্কঃ
  • আপডেট সময় : শনিবার, ২৩ জানুয়ারি, ২০২১
  • ১৫৬ বার পঠিত

চলনবিলের জলরাশির ‘নৌকা স্কুল’ শিক্ষা বিস্তার ত্বরান্বিত করছে। বিশ্বের দেশে দেশে এই নৌকা স্কুল জলবায়ু পরিবর্তন ও পৃথিবীর ভবিষ্যতের লড়াইয়ে এখন বড় মডেল। অনেক দেশে বাংলাদেশের এই মডেলে জলবায়ু মোকাবেলায় স্কুল শিক্ষা চালু রাখা হয়।

বিলপাড়ের নিভৃত গ্রামের এক তরুণ প্রকৌশলীর সৃষ্টিশীল ভাবনার ফসল এই নৌকা স্কুল। তার নাম মোহাম্মদ রেজোয়ান। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে তিনি যুক্তরাজ্যের একটি প্রকাশনার ক্লাইমেট রেবেল (জলবায়ু সংগ্রামী) খেতাব পেয়েছেন। তার এই উদ্ভাবন বিশ্বের দেশে দেশে প্রশংসিত হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম প্রকাশনা সংস্থা পেঙ্গুইন র‌্যানডম হাউস থেকে প্রকাশিত পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক বেন লাকউল রচিত ক্লাইমেট রেবেল বইয়ে দুই শতাব্দীর বিশ্বের কোন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান জলবায়ুর রক্ষায় সংগ্রাম করেছেন তাদের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের নৌকা স্কুল ও তার উদ্ভাবক রেজোয়ান একজন। বলা হয়েছে, একজন ব্যক্তির ছোট ছোট উদ্যোগ ও প্রচেষ্টাগুলো ধীরে ধীরে বড় শক্তিশালী হয়ে বিশ্বের পরিবর্তনে বড় ভূমিকা রাখে। নৌকা স্কুল তার একটি।

রেজোয়ান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে স্থাপত্যবিদ্যায় ডিগ্রী নিয়েছেন। তার উদ্ভাবিত এমন স্কুল মডেল নিয়ে কাজ করছে বিল এ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন। জাতিসংঘের ফান্ডস এ্যান্ড প্রোগ্রামসের ইউনিসেফ, ইউএনইপি, ইউএনডিপির উদ্ভাবন শাখায় স্বীকৃতি পেয়েছে। যুক্তরাজ্যের প্রকাশনা সংস্থা ‘নজি ক্রো’ বাংলাদেশে নৌকা স্কুল উদ্ভাবক মোহাম্মদ রেজোয়ানকে ‘আর্থ হিরো’ স্বীকৃতি দিয়েছে। নৌকা স্কুলের খবর পৌঁছে যায় বিশ্বের অন্যতম সেরা ধনী বিল গেটসের বিল এ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের কাছে।

অনুদান মেলে পাঁচ হাজার ডলার। সেই অর্থে বর্তমানে রেজোয়ানের নৌকা স্কুলের সংখ্যা ১০০টির বেশি। যা তিন জেলার ভেতরে থাকা বিশাল বিলের প্রতিটি ঘাটে ভিড়ছে। জলবায়ু ঝুঁকির মধ্যে থাকা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, স্লোভেনিয়া, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, নাইজিরিয়া, জাম্বিয়া, ফিলিপিন্সসহ কয়েকটি দেশ এই মডেল গ্রহণ করে বাস্তবায়িত করেছে। ওইসব দেশের পাঠ্যপুস্তকেও স্থান পেয়েছে এই স্কুল। স্থপতি রেজোয়ান যুক্তরাজ্যের রয়েল সোসাইটি অব আর্টসের একজন ফেলো। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারন্যাশনাল ভিজিটর লিডারশিপ প্রোগ্রামের প্রাক্তন শিক্ষার্থী। ২০১৬ সালে শ্রী সত্যসাঁই এ্যাওয়ার্ড ফর ডিজাইন এক্সিলেন্স, ২০১৭ সালে কেরিস্টোন ডিজাইন পুরস্কার পেয়েছেন। রেজোয়ানের কীর্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্মিথসোনিয়ানস, কুপারহিউইট ন্যাশনাল ডিজাইন মিউজিয়াম, সুইজারল্যান্ড ও ফ্রান্সের স্থাপত্য বিষয়ক বেঙ্গল স্ট্রিমে প্রদর্শিত হয়েছে।

নৌকা স্কুল অনানুষ্ঠানিক পাঠের একটি ভাসমান স্কুল। বিল ও নদী তীরের গ্রামের দরিদ্র পরিবারের ছেলেমেয়েরা যখন দূরের কোন স্কুলে যেতে পারে না, তখন শিক্ষা বিঘ্নিত হয়। প্রাথমিক স্কুলে ভর্তির পরও নানা কারণে ঝরে পড়ে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের এই দেশে বন্যার সময় অনেক প্রাথমিক স্কুলে পানি ওঠে। পাঠ বন্ধ থাকে। মৌসুমি বন্যায় দেশের এক-পঞ্চমাংশ এবং বড় বন্যায় তিন ভাগের দুই ভাগ তলিয়ে থাকে। শিশু শিক্ষার্থীদের পাঠক্রম সাময়িক স্থগিত হয়ে পড়ে। বন্যায় বিলের গ্রামের শিশুরা যেন পাঠ থেকে দূরে না থাকে, সেই লক্ষ্যেই বিলপাড়ের প্রকৌশলী মোহাম্মদ রেজোয়ান বনিয়েছেন নৌকা স্কুল।

উত্তরাঞ্চলের নাটোরের চলনবিলপাড়ের গুরুদাসপুর উপজেলার প্রত্যন্ত সিঁধুলাই গ্রামের ছেলে রেজোয়ান। বেড়ে উঠেছেন চলনবিলের জলরাশির মধ্যে। বৃষ্টি ও বন্যার কারণে স্কুলে যেতে না পারার অভিজ্ঞতা তার আছে। নৌকা ছাড়া যাতায়াতের কোন পথ ছিল না সেই সময়ে। শিশুমনেই গেঁথে যায় এই অবস্থার পরিবর্তনের চেষ্টা করবেন। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে ১৯৯৮ সালে স্থাপত্যবিদ্যায় স্নাতক করেন। শিশু মনের ভাবনার বীজ তরুলতায় মেলে যায়- নৌকার মধ্যে স্কুল গড়া। ৫৫ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১৪ ফুট প্রস্থের একটি নৌকা বানিয়ে তার ওপর বাঁশ বেতের বড় ধরনের ছাউনি (ছই) এঁটে দেন। কাঠের পাটাতন থাকে। ঘরের মতো দরজা জানালাও থাকে। পাঠদানের কক্ষ বানান নৌকার মধ্যেই। এক সঙ্গে ৩০ জন শিশু পাঠ নিতে পারে। এই নৌকা স্কুল পরিচালনার জন্য টিম তৈরি করেন। এভাবে প্রথম নৌকা স্কুল চালু হয় ২০০২ সালে। রেজোয়ান স্কলারশিপের পাঁচশ’ ডলার দিয়ে প্রথম এই স্কুল তৈরি করেন।

এই স্কুলের উপস্থিতির হার বেড়েছে। নৌকা স্কুলের সুযোগ-সুবিধা দিনে দিনে বাড়ানো হয়। নৌকার ছাদে বসানো হয় সোলার প্যানেল। রাতেও বিদ্যুত বাতিতে পাঠদান চলে। ছোটদের পাশাপাশি বড়দের কম্পিউটার শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। সংযুক্ত করা হয় পাঠাগার। ডিভাইসে সাজানো হয় তথ্যপ্রযুক্তির কম্পিউটার ল্যাব। গ্রামের অনেক শিক্ষিত লোক ডিজিটাল প্রযুক্তির অন্তর্ভুক্ত হচ্ছেন নৌকা স্কুলে। বিলপাড়ের গ্রামের শিশু আর শিক্ষা বিমুখ থাকছে না। চলনবিলের গ্রাম ছাড়াও নদীতীরের গ্রামগুলোতে ভিড়ে এমন সুযোগ করে দিয়েছে নৌকা স্কুল। পরিবর্তনের ধারায় স্বর্ণদুয়ার খুলছে একের পর এক। বিশ্বের অনেক শিক্ষাবিদ ও সাংবাদিক বলেছেন, বাংলাদেশের রেজোয়ানের কাছে থেকে শিক্ষা নেবে পৃথিবী। রেজোয়ান বলেন, ভয়াবহ বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের মধ্যে মানুষকে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করতে দেখেছেন। পর্যাপ্ত রিসোর্স ও সহযোগিতা পেলে তারা বড় কিছু করে দেখাতে পারব। মানুষের এই আত্মবিশ্বাস ভাসমান স্কুল ডিজাইনে অনুপ্রাণিত করেছে। উদ্ভাবনের পর ১৯ বছর ধরে উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ অব্যাহত রয়েছে এবং আধুনিকায়ন হচ্ছে।

রেজোয়ান জানান, নৌকা স্কুলকে আরও উন্নত করে অনানুষ্ঠানিক শিক্ষার সঙ্গে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক এমনকি স্নাতকোত্তর পর্যায়েও নিয়ে যাওয়া সম্ভব। এমন স্বপ্ন দেখছেন তিনি। এই নৌকা স্কুলের ওপর ‘ইজি লাইক ওয়াটার’ নামে একটি তথ্যচিত্র নির্মিত হয়েছে। যা বিশ্বের দেশে দেশে প্রদর্শিত হয়ে বাংলাদেশের এই বড় অর্জন সমর্থিত হয়েছে। রেজোয়ান নিজ গ্রামে ‘সিঁধুলাই স্বেচ্ছাসেবী’ নামের অলাভজনক সংগঠন গড়ে তুলেছেন।
নিউজটি শেয়ার করুন।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরও খবর